Search Any Post Of WizBD.Com
 HomeHistoricalযে ভাবে তৈরী করা হতো মমি

যে ভাবে তৈরী করা হতো মমি

“মমি” শব্দটা শুনলে তোমার কী মনে আসে? পিরামিডের ভেতর অন্ধকার ঘরে একটা বাক্স, তার ভেতর সারা শরীর ব্যান্ডেজের মত করে প্যাঁচানো একটা লাশ, সাথে একটা ভূতুড়ে অনুভূতি! তাই কি?  তোমাদের মধ্যে যারা এই লেখাটি পড়ছো, তারা মমি চেনো না এমন হওয়াটা প্রায় অসম্ভব। বিভিন্ন কার্টুন সিনেমার বদৌলতে ছোটবেলা থেকেই আমরা মমির সাথে পরিচিত। এমনকি ‘মিশর’ শব্দটি শুনলেও পিরামিডের সাথে সাথে মমির কথা মনে পড়ে যায়!1234

ছোটবেলায় মমি নিয়ে আমার ভীষণ আগ্রহ ছিল, কী করে এটা বানায়? কেমন করে একটা মৃতদেহ সহস্র বছর অক্ষত থাকে? পরে যখন সত্যিই জেনে ফেললাম, তখন ব্যাপারটা দারুণ ইন্টারেস্টিং মনে হল! তাই চলো জেনে নিই কী করে প্রাচীন মিশরীয়রা মৃতদেহ থেকে মমি বানাতো!

কী এই  মমি? কোথা  থেকেই  বা  এটা এলো?

তোমরা কম বেশি সবাই জানো হয়তো, মৃত্যুর পর আমাদের দেহের ভেতরের এনজাইমের কারণে মৃতদেহটি বাতাসের সংস্পর্শে এসে পচে যেতে  থাকে। কিন্তু মমি হল এমন একটি মৃতদেহ  যা কখনোই  পঁচে না বা প্রাকৃতিকভাবে ধ্বংস হয় না। কারণ বিভিন্ন কেমিক্যাল আর ঔষধ দিয়ে কাপড়ে পেঁচিয়ে মৃতদেহটিকে পঁচন থেকে রক্ষা করা হয়।

‘মমি’ শব্দটি এসেছে ফ্রেঞ্চ শব্দ ‘মোমি’ (momie)  থেকে। কিন্তু শব্দটির মূল উৎস হল পারস্য শব্দ ‘মোম’ (wax) আর এই মোম থেকে এসেছে আরবি ও ল্যাটিন শব্দ “মুমিয়া”। মুমিয়া থেকে এখন এই শব্দটি হয়ে গিয়েছে “মমি”। অনেকের মতে মমি বানানো প্রথম শুরু করে মিশর। তবে ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায় মিশরীয়দের এক হাজার বছর আগেই উত্তর চিলি আর দক্ষিণ পেরুতে মমি বানানো হতো। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে তার কিছু ধ্বংসাবশেষও আছে।

বৃটিশ মিউজিয়াম এ সংরক্ষিত মমি

কেন ও কী করে মমি বানানো হতো ?

প্রাচীন মিশরীয়রা মনে করত মৃত্যুর পর, মানুষ পরকালে তাদের জীবন আবার শুরু করবে। আর সেই জীবনে যাওয়ার জন্য তাদের মৃতদেহ সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। আর এই সংরক্ষণ করে রাখার জন্য মমি তৈরি করা হতো। তবে মমি কেবল  মিশরের ধনী ও উচ্চবর্গীয় ব্যক্তিদেরই করা হতো।

কীভাবে সেই মমি বানানো হতো চলো এবার তা দেখে নিই!

১) মমি করার আগে প্রথমেই মৃতদেহটিকে নিয়ে যাওয়া হতো ‘ইবু’ (ibu) নামের একটি ঘরে। “ইবু” অর্থ হলো “বিশুদ্ধকরণ স্থান”। ইবুতে মৃতদেহটিকে ভালো মতো ধোয়া হত সুগন্ধযুক্ত “তাড়ি” নামের তালের রস থেকে তৈরি মদ দিয়ে। এরপর নীলনদের পানি দিয়ে ভালোমতো দেহটিকে পরিষ্কার করা হতো।

ইবুতে চলছে পরিষ্কারকরণ প্রক্রিয়া

২) এরপর ইবু থেকে দেহটিকে নিয়ে যাওয়া হতো “ পার- নেফার”(per-nefar) এ। এটাকে ‘মমিকরণ’ কক্ষ বললেও ভুল হবে না। কারণ এখানেই শুরু করা হত মমি তৈরির মূল কাজ।

৩) পার – নেফারে নেয়ার পর দেহটিকে একটি টেবিলের উপর রেখে প্রথমে মৃতদেহটির বাম দিক থেকে এর ভেতরের পচনশীল অঙ্গগুলো, যেমন : যকৃত, ফুসফুস, পাকস্থলী এবং অন্ত্র বের করে আনা হতো। কিন্তু হৃদপিণ্ডটিকে কিছুই করা হত না। কারণ তারা ভাবতো মানুষের সব আবেগ অনুভূতি ও শক্তির  মূল কেন্দ্র হল এই হৃদপিণ্ড।

যাই হোক,বের করে নেওয়ার পর অঙ্গগুলোকে ভালো করে ধুয়ে ‘রজন’ নামের এক ধরনের গাছের আঠালো রসের প্রলেপ দিয়ে পাটের কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে এক ধরণের বিশেষ পাত্রে রাখা হতো। এ বিশেষ পাত্রগুলোকে বলা হয় “ক্যানোপিক জার “(canopic jar )। এই ক্যানোপিক জারগুলো আবার চার রকম, যেসবের আবার ভিন্ন ভিন্ন নামও আছে। নামগুলো হল- ইনসেটি, হাপি, ডুয়ামেটেফ, আর কেবেহসেনুয়েফ। এই চারটি জারে যথাক্রমে  যকৃত, ফুসফুস, পাকস্থলী  আর অন্ত্র রাখা হতো।

৪) পচনশীল অঙ্গগুলো বের করার পর এবার মগজটা বের করার পালা। একটা লম্বা মতন হুকের সাহায্যে নাকের ভেতর কায়দা করে  একটা লম্বা চামচ এর মত জিনিস দিয়ে পুরো মস্তিষ্কটা বের করে আনত। তবে এত কষ্ট করে বের করা মস্তিষ্ক কিন্তু তারা  সংরক্ষণ করত না! কারণ তারা ভাবতো মগজ আসলে অপ্রয়োজনে একটা জিনিস, তাই তারা এটা বের করে ফেলে দিত!

৫)এখন পুরো শরীরটিতে বাইরের অঙ্গগুলো ছাড়া বলতে গেলে আর কিছুই নেই। ভেতরের অঙ্গগুলো সরানোর পর যে জায়গাটি ফাঁকা হয়ে গেল, সে জায়গাটি এখন ভরে দেয়ার পালা। নয়তো মৃতদেহটিকে তো আর জীবিতদের মতো লাগবে না! তাই ফাঁকা স্থানটি ভালোমতো তাড়ি দিয়ে মুছে ফেলা হতো। এরপর ওই বাম দিকের কাটা অংশটা দিয়ে ধুপ ও অন্যান্য পদার্থ ভরে দেয়া হতো।

৬) এবার পুরো দেহটিকে ন্যাট্রন (natron ) পাউডারে মুড়ে দেয়া হতো। ন্যাট্রন হলো এক ধরণের লবণ। এই ন্যাট্রন এর কাজ হল চামড়ার রঙ খুব একটা  পরিবর্তন না করেই  মৃত দেহের সব জলীয় পদার্থ শোষণ করে ফেলা। আর এই শোষণ কাজটি করার জন্য ন্যাট্রনএর সময় লাগত ৩৫ থেকে ৪০ দিন।

৭) ৪০ দিন পর মমিটিকে নিয়ে আনা হতো ওয়াবেট নামক ঘরে। এই ঘরে শুকিয়ে যাওয়া মৃতদেহটি  থেকে বের করে আনা হবে সেইসব ভরে দেয়া  ধুপ  ও অন্যান্য পদার্থ। তাহলে এখন  ফাঁপা জায়গাটিতে কী থাকবে? এখন ওই ফাঁকা স্থান ভরে দেওয়া হবে ন্যাট্রন, রজনে সিক্ত পাটের কাপড় ও আরো কিছু পদার্থ দিয়ে। ফাঁকা জায়গা ভরাট করে আবার আগের মত হয়ে যাওয়া দেহটির কাটা স্থানগুলো এবার সেলাই হবে। এরপর দেওয়া হবে রজনের প্রলেপ। আর এর পরে শুরু হবে সবচেয়ে জটিল প্রক্রিয়া। ব্যান্ডেজ দিয়ে দেহটিকে মুড়িয়ে দেওয়ার কাজ।

8) লিনেনের পাতলা কাপড়ের ব্যান্ডেজ দিয়ে পুরো শরীরটিকে মুড়িয়ে দিতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগে যেত। ব্যান্ডেজ করার শুরু হতো মাথা ও গলা দিয়ে, এরপর থেকে একে একে হাত পা আর পুরো শরীরটাই মুড়িয়ে দেয়া হতো। আবার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে আলাদা করে ব্যান্ডেজ করে দেয়া হতো। এই ব্যান্ডেজটা কিন্তু কেবল এক স্তর করে দিয়েই শেষ হয়ে যেত না। কয়েক স্তর ব্যান্ডেজ করা হতো। আর প্রতি স্তরকে জোড়া লাগানোর জন্য ব্যবহার করা হতো রজেন। আর ব্যান্ডেজ করার পুরো সময়টিতে পড়া হত মন্ত্র। ব্যান্ডেজ করা শেষ হলে মমির হাত-পা একসাথে বেঁধে হাতের মাঝে “ বুক অফ ডেড” থেকে নেওয়া প্যাপিরাসে লেখা মন্ত্র আটকানো থাকতো।

9)  এরপর মৃতের শরীরের বিভিন্ন অংশে লাগানো হত শক্ত খাঁচা। আর মাথায় পরিয়ে দেয়া হত মুখোশ। মুখোশটি বানানো হতো হয় মৃত ব্যক্তির সাথে মিল রেখে, নয়তো কোন মিশরীয় দেবতার মুখের মত করে; মিশরীয়দের মতে এই খাঁচার পোশাক মৃতের আত্মাকে সঠিক দেহ খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

10) সবশেষে এখন খাঁচা সমেত মমিটিকে কফিনে ভরার পালা। কফিনে শুধু মমিটিকেই ভরা হত না, পরকালে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন খাবার আর মূল্যবান গহনা ভরে দেয়া হতো! আর এভাবেই শেষ হতো পুরো প্রক্রিয়া।

ছোটবেলায় “স্কুবি ডুবি ডু” নামের এক কার্টুন দেখে আমি প্রথম মমি চিনেছিলাম। তুমি কীভাবে চিনেছিলে? কমেন্ট করে জানিয়ে দিও! মমি নিয়ে কিন্তু মুভিও আছে,চাইলে দেখে নিতে পারো ‘’The Mummy” মুভিটি। আর যদি আগেই দেখে থাকো তাহলে চাইলে জানিয়ে দিতে পারো কিন্তু!

ছবি:

১. ancientegypt.co.uk

২. google.com

তথ্যসূত্র :

১.http://www.ancientegypt.co.uk/mummies/story/page2.html

২.https://bn.m.wikipedia.org/wiki/%E0%A6

4 weeks ago (7:41 am) 356 views
Report

About Author (2)

Samin12
Contributor

If you believe you can.

Leave a Reply

You must be Logged in to post comment.

Related Posts

Copyright © WizBD.Com, 2018-2019